হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্ব ৪ (ক)
হযরত আলীকে (আ) গালমন্দ করার জঘন্য ঘৃণ্য বিদ'আত ও কুপ্রথার প্রবর্তক স্বয়ং পাপীষ্ঠ মুয়াবিয়া নিজেই: ৩৬৬২। আমের ইবনে সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন: মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সা'দকে (গালমন্দ করার) নির্দেশ দিয়ে বলেন, আবু তুরাবকে গালি দিতে তোমায় কিসে বাধা দিল?
সা'দ বলেন, যতক্ষণ আমি তিনটি কথা স্মরণ রাখব, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ততক্ষণ আমি তাকে গালমন্দ করব না। এগুলোর একটি কথাও আমার কাছে লাল রংয়ের উট প্রাপ্তির চাইতেও অধিক প্রিয়। (এক) আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে
আলীর (আ.) উদ্দেশ্যে একটি কথা বলতে শুনেছি, যখন তিনি তাকে মদীনায় তার স্থলাভিসিক্ত নিযুক্ত করে কোনো এক যুদ্ধাভিযানে যান। তখন তাঁকে বলেন,হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে শিশু ও নারীদের সাথে রেখে যাচ্ছেন?
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন: হে আলী! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার স্থান আমার কাছে মূসা (আ.)র কাছে হারূন (আ.)র অনুরূপ? কিন্তু (পার্থক্য এই যে,) আমার পরে কোন নবী নেই। (২) আমি খাইবারের (যুদ্ধাভিযানের) দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি: আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে (যুদ্ধের) পতাকা অর্পণ করব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাঁকে ভালোবাসেন। রাবীর বলেন, সকলে তা পাওয়ার আশা করতে থাকে।
তিনি বলেন: তোমরা আলীকে আমার কাছে ডেকে আন। রাবী বলেন, তিনি তার নিকট এসে উপস্থিত হন, তখন তাঁর চোখ উঠেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দুচোখে নিজের মুখ নি:সৃত লালা লাগিয়ে দেন এবং তার হাতে পতাকা অর্পণ করেন।
আল্লাহ তায়ালা তাকে বিজয়ী করলেন। (তিন) যখন এ আয়াত নাযিল হল (অনুবাদ): আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারীগণকে ও তোমাদের নারীগণকে...."(৩:৬১), তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে ডাকেন (এবং তাদেরকে নিয়ে উন্মুক্ত ময়দানে গিয়ে) বলেন: ইয়া আল্লাহ! এরা সবাই আমার পরিবার-পরিজন (আ,মু)
আবূ ঈসা বলেন,এ হাদীসটি হাসান ও গরীব এবং উপরোক্ত সূত্রে সহীহ।(দ্রঃ জামে আত-তিরমিযী,ষষ্ঠ খণ্ড,পৃ:৩২৬)
অথচ কোন ব্যক্তিকে গালমন্দ করা ঐ ব্যক্তির প্রতি গালিগালাজ কারীর ক্রোধ, অসন্তুষ্টি, শত্রুতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ থেকে উদ্ভূত এবং যাকে গালি দেওয়া হয় তাঁকে রাগন্বিত ও ক্রোধান্বিত করার কারণ।
মানাভী (مناوي) ফাইযুল ক্বদীর গ্রন্থে "নিশ্চয়ই ফাতিমা আমার দেহের টুকরা (অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ); অতএব যে ব্যক্তি তাঁকে রাগম্বিত করে সে আমাকেই রাগম্বিত করে।"-এ হাদীসটি উদ্ধৃত করার পর লিখেছেন: এ হাদীসটি দিয়ে সুহাইলী প্রমাণ করেছেন যে যে ব্যক্তি তাঁকে গালি দেয় সে কুফর করে (অর্থাৎ হযরত ফাতিমাকে গালিগালাজ কারী কাফির হয়ে যাবে)।
কারণ সে তাঁকে অর্থাৎ ফাতিমাকে রাগম্বিত করে এবং তিনি (ফাতিমা) শাইখাইনের (হযরত আবুবকর ও হযরত উমর) চেয়ে উত্তম (আফযাল)। [দ্রঃ:ফাইযুল ক্বদীর, খ:৪, পৃ:৪২১, ফা অক্ষর, হাদীস নং ৫৮৩৩, হাক্বীক্বাত-ই হুজূম্ বে খনেয়ে হাযরাত ফাতিমা-ই যাহরা আয মানাবেয়ে আম্মাহ্,পৃ:২১-২২ থেকে উদ্ধৃত]
আর হযরত আলীর (আ) প্রতি শত্রুতা,ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ নিফাক ও মুনাফিক হওয়ার আলামত ও লক্ষণ:
৩৬৭৩। আলী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মী নবী (সা.) আমাকে এ ওসিয়াত করেন যে,মুমিনরাই তোমাকে মহব্বত করবে এবং মোনাফিকরাই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে।....আবু ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান ও সহীহ। (দ্রঃ জামে আত-তিরমিযী,ষষ্ঠ খণ্ড,পৃ:৩৩২)
হযরত আলীকে (আ.) গালি দেওয়া হযরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) গালি দেওয়ার শামিল:
হাদীস নং ৪৬৭৩। আবূ আব্দিল্লাহ আল-জাদালী থেকে। তিনি বলেন: আমি হযরত উম্মে সালামার কাছে প্রবেশ করলে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মাঝে কি রাসূলুল্লাহকে (সা.) গালি দেওয়া হয়? "অত:পর আমি 'আল্লাহর কাছে পানাহ চাই' অথবা 'সুবহানাল্লাহ' অথবা এমন ধরনের কোনো কথা (বাক্য) বললাম। তখন তিনি বললেন, "আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি যে "যে ব্যক্তি আলীকে গালি দেয় সে আমাকেই গালি দেয়।"
হাকিম নিশাপুরী বলেন: এটা সহীহুল ইসনাদ হাদীস এবং তাঁরা (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) তা ইখরাজ (স্বীয় সহীহ হাদীস গ্রন্থে পূর্ণ সনদ সহ রেওয়ায়ত) করেন নি....।
আর আল্লামা যাহাবী তালখীস গ্রন্থে হাকিম নিশাপুরীর সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন: উক্ত হাদীসটি সহীহ। (দ্রঃ আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন,খ:৩,পৃ:৩৩৪, হাদীস নং ৪৬৭৩)
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে হযরত আলীকে গালি দেওয়া হযরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) গালি দেওয়া এবং রাসূলুল্লাহকে (সা.) গালি দেওয়া মানেই মহান আল্লাহকে গালি দেওয়া যা হচ্ছে কুফর ও নিফাক। অথচ মাল'ঊন মুয়াবিয়ার প্রবর্তিত ঘৃণ্য জঘন্য এ বিদ'আতটি বনী উমাইয়া খিলাফত দীর্ঘ ৯০ বছর ধরে মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত রেখেছিল এবং মসজিদের মিম্বর থেকে প্রতি নামাযের পর হযরত আলীকে এবং মহানবীর আহলুল বাইতকে গালিগালাজ করা হত।
আর হযরত আলীকে গালি দেওয়া আলীকে মনোকষ্ট ও যাতনা দেওয়া (إیذاء)। আর আলীকে মনোকষ্ট ও যাতনা দেওয়া হযরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) মনোকষ্ট ও যাতনা দেওয়া এবং রাসূলুল্লাহকে কষ্ট ও যাতনা দেওয়া মহান আল্লাহকে কষ্ট ও যাতনা দেওয়া (ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট করা)। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট ও যাতনা দেয় সে দুনিয়া ও আখেরাতে মাল'ঊন ও অভিশপ্ত। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে:
إن الذین یؤذون الله و رسوله لعنهم الله في الدنیا و الآخرة و أعدّ لهم عذاباً مُهیناً
নিশ্চয়ই যারা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট ও যাতনা দেয় তাদেরকে মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে লানৎ দিয়েছেন (অর্থাৎ তাঁর রহমত থেকে দূর ও বঞ্চিত করে দিয়েছেন) এবং তাদের জন্য এক অপমান জনক শাস্তি বরাদ্দ ও প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সূরা-ই আহযাব:৫৭)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:যে ব্যক্তি আলীকে ভালবাসে সে আমাকে ভালবাসে এবং যে ব্যক্তি আলীকে ঘৃণা করে সে আমাকেই ঘৃণা করে, এবং যে ব্যক্তি আলীকে কষ্ট ও যাতনা দেয় সে আমাকে কষ্ট ও যাতনা দেয় এবং যে আমাকে কষ্ট ও যাতনা দেয় সে মহান আল্লাহকেই কষ্ট ও যাতনা দেয় (অর্থাৎ ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট করে) (দ্রঃ আল-ইস্তী'য়াব ফী আসমাইল্ আসহাব,খ:২, পৃঃ ৪৮)
و قال (ص):من أحبّ علياً فقد أحبّني،ومن أبغض علياً فقد أبغضني،و من آذىٰ علياً آذاني،و من آذاني فقد آذى الله.
হযরত আলী (আ.) যেহেতু মহানবীর (সা.) সুন্নাহর পূর্ণ নিষ্ঠাবান পাবন্দ ও অনুসারী ছিলেন সেহেতু বনী উমাইয়া খিলাফত প্রশাসন তাঁর (আলীর) বিরোধিতা করতে গিয়ে মহানবীর (সা.) সুন্নাহ ও হাদীসের বিরোধিতা করত: সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে।
তিনি বলেন: আমরা আরাফাতের ময়দানে ইবনে আব্বাসের কাছে ছিলাম। তিনি বললেন: "হে সাঈদ! কি হয়েছে যে জনগণকে তালবিয়া ধ্বনি দিতে শুনছি না?" অত:পর আমি বললাম: "তারা মুয়াবিয়াকে ভয় করে।" এরপর তিনি তাঁর তাঁবু থেকে বের হয়ে বললেন: লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইক, এমনকি যদি মুয়াবিয়ার নাসিকাও মাটিতে ঘর্ষিত হয়, লাব্বাইক।হে আল্লাহ তাদেরকে (মুয়াবিয়া ও তার দলবলকে) লা'নত দিন। কারণ,তারা হযরত আলীকে ঘৃণা করার কারণে মহানবীর (সা.) সুন্নাহকে ত্যাগ ও বর্জন করেছে।
এ হাদীসটির পাদটীকায় সিন্দী বলেন: অর্থাৎ তাঁকে -- আলীকে-- ঘৃণা করার জন্য।হযরত আলী মহানবীর (সা.) সুন্নাহর অত্যন্ত পাবন্দ (মুতাক্বাইয়িদ) ছিলেন; আর এরা (বনী উমাইয়া) তাঁকে ঘৃণা (বুঘযبغض) করার কারণে মহানবীর সুন্নাহ সমূহ ত্যাগ ও বর্জন করেছিল। (সুনানুন নাসায়ী, খ:৫,পৃ:২৫৩;সুনানুল কুবরা,খ:৭,পৃ:২৪৪)
রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নত সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান একমাত্র হযরত আলীরই (আ.) আছে: ইবনে আব্বাস বলেন: হযরত আলী জ্ঞানের (ইলম) নয় দশমাংশ একাই প্রাপ্ত হয়েছিলেন, খোদার শপথ! জ্ঞানের অবশিষ্ট এক দশমাংশেও তিনি সকল জনগণের সাথে শরীক ছিলেন (এর অর্থ হলো যে হযরত আলী ঐ অবশিষ্ট এক দশমাংশ যা সকল লোকেরা জানে তা জানতেন অর্থাৎ তিনি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের [জ্ঞানের দশ দশমাংশের] অধিকারী ছিলেন)। (দ্রঃউসদুল ঘাবাহ্ ফী মা'রিফাতিস সাহাবাহ্,খ:৩,পৃ:৫৯৬ এবং আল-ইস্তী'য়াব ফী আসমাইল্ আসহাবে,আ:২,পৃ:৫০)
আব্দুল মালেক ইবনে (আবী) সালমান বলেন: আমি আতাকে বললাম: "হযরত মুহাম্মদের (সা.) সাহাবাদের মাঝে হযরত আলীর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ ছিল কি?" তিনি বলেছিলেন: "না,মহান আল্লাহর শপথ! (ঐ ব্যক্তি যে হযরত আলীর চেয়ে অধিক জ্ঞানী হবেন) তাঁকে আমি চিনি না (অর্থাৎ হযরত আলীর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কোন সাহাবী বা ব্যক্তি ছিল না)।" (দ্রঃ আল-ইস্তী'য়াব্ ফী আসমাইল্ আসহাব,খ:২,পৃ:৫০)
হযরত আয়েশা বলেছেন: তবে জেনে রাখ যে নিশ্চয়ই তিনি (হযরত আলী) জনগণ অর্থাৎ উম্মাহর মধ্যে (মহানবীর) সুন্নাহ্ সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী।) দ্রঃ আল-ইস্তী'য়াব ফী আসমাইল্ আসহাব,আ:২,পৃ:৫০)
قالت (عايشة):أما إنه لأعلم الناس بالسنة
ইবনে আব্বাস বলেন: হযরত আলী থেকে সাবার অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি (কোনো কথা বা হাদীস বা অভিমত) আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন তখন আমরা তা ত্যাগ ও বর্জন করতাম না। (দ্রঃআল-ইস্তী'য়াব ফী আসমাইল্ আসহাব,খ:২,পৃ:৫০)
عن ابن عباس قال:كنا إذا أتانا الثبت عن علي لم معدل به.
মহানবী (সা.) নিজ আসহাবের ব্যাপারে বলেছেন: তাঁদের (আসহাব অর্থাৎ সকল সাহাবার) মধ্যে সবচেয়ে ন্যায় বিচারক হচ্ছেন আলী ইবনে আবী তালিব (দ্রঃ আল-ইস্তী'য়াব ফী আসমাইল্ আসহাব,খ:২,পৃ:৪৯)
و قال (ص) في أصحابه: أقضاهم علي بن أبي طالب
হযরত উমর বলেন:.... এবং আমাদের মধ্যে সব চেয়ে ন্যায় বিচারক হচ্ছেন আলী..। (দ্রঃ সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ৪৪৮১,পৃ:১০৯৪)
قال عمر (رض): .... و أقضانا علي ....
রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহর ওপর হযরত আলীর শাহাদাত বরণ:
হাদীস নং ৪৭৪৪।হাইয়ান আল-আসাদী থেকে। তিনি বলেন: আমি আলীকে বলতে শুনেছি: হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেছেন: নিশ্চয়ই আমার পরে উম্মত শীঘ্রই তোমার সাথে খিয়ানত ও গাদ্দারী করবে।আর তুমি তখন আমার মিল্লাতের (ধর্ম) ওপর জীবনযাপন করবে। তুমি আমার সুন্নাহর ওপর নিহত (শহীদ) হবে; যে তোমাকে ভালবাসে সে আমাকে ভালবাসে এবং যে তোমাকে ঘৃণা করে সে আমাকে ঘৃণা (বুঘয ও ইবঘায) করে।আর নিশ্চয়ই এটা এখান থেকে রক্ত রঞ্জিত হবে অর্থাৎ মাথা থেকে দাঁড়ি পর্যন্ত পুরো চেহারা মুবারক রক্তে রঞ্জিত হবে।
হাকিম নিশাপুরী বলেন: এ হাদীসটি সহীহ।
আর আল্লামা যাহাবী তালখীস গ্রন্থে হাকিম নিশাপুরীর সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন:এই হাদীসটা সহীহ। (দ্রঃ আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন,খ:৩,পৃ:৩৫৩, হাদীস নং ৪৭৪৪)
সত্য (হক) ও পবিত্র কুরআনের সাথে হযরত আলীর অটুট অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক:
হাফিয আবুল মুআইয়াদ্ খাতীব আল-খ্বারাযমী হযরত উমরের (রা) পরে খলীফা নির্বাচনকারী শুরায় (পরামর্শ সভা) হযরত আলীর ইহতিজাজের (তার খিলাফত ও বেলায়তের ব্যাপারে তার ন্যায্য হক ও অধিকার সংক্রান্ত যুক্তি পেশ করা) ঘটনা উল্লেখ করার সময় সনদ উল্লেখ করে লিখেছেন: হযরত আলী বলেন: আমি তোমাদেরকে মহান আল্লাহর কাছে শপথ দিয়ে চ্যালেঞ্জ করছি যে তোমাদের জানা আছে কি যে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:সত্য আলীর সাথে এবং আলী সত্যের সাথে। আলী যেভাবেই ঘুরুক না কেন ঠিক সেভাবেই সত্য আলীর সাথে ঘুরে। "তখন সবাই বলল: "আল্লাহর শপথ! হ্যাঁ।"
فأنشدکم الله أتعلمون أن رسول الله (ص) قال: الحق مع علي و علي مع الحق،یدور الحق مع علي کیف ما دار؟
(দ্রঃ আল-মানাক্বিব,১৯ তম অধ্যায়,পৃ:২২৩,হাক্ব্ ব আলী আস্ত [সত্য আলীর সাথে],পৃ:৬৬-৬৭ থেকে উদ্ধৃত)
ইহতিজাজ (احتجاج) শব্দের অর্থ:যুক্তি ও প্রমাণ পেশ করা,প্রমাণ উপস্থিত (উপস্থাপন) করা, কোনো বিষয়ে যুক্তি বা আপত্তি পেশ করা; হজ্জ সমাপন করা (দ্রঃ বাংলা একাডেমি আরবী-বাংলা অভিধান,১ম খণ্ড,পৃ:৬৬)
হাদীস নং ৪৬৬৯।আমরাহ বিনতে আব্দুর রহমান থেকে। তিনি বলেন: যখন আলী বসরার দিকে রওয়ানা হন তখন বিদায় নেওয়ার জন্য তিনি নবী পত্নী হযরত উম্মে সালামার কাছে প্রবেশ করেন।তখন উম্মে সালামা বললেন: "মহান আল্লাহর হেফাযত ও যিম্মায় সফর করুন। মহান আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আপনি সত্যের ওপর আছেন এবং সত্যও আপনার সাথে আছে।আর যদি না আমি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (আদেশের) বিরুদ্ধাচরণ করা অপছন্দ করতাম,কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে আমাদের বাড়ীতে থাকার আদেশ করেছিলেন তাহলে আমি আপনার সাথে বের হতাম ও সফর করতাম।তবে মহান আল্লাহর শপথ!আমি অবশ্যই আপনার সাথে তাকে প্রেরণ করেছি যে আমার কাছে সর্বোত্তম এবং আমার নিজের চেয়েও আমার কাছে অধিক প্রিয় অর্থাৎ আমার ছেলে উমরকে।"
হাকিম নিশাপুরী বলেন: শাইখাইনের (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) শর্তে এতদ সংক্রান্ত হাদীসসমূহের সবগুলোই সহীহ যদিও তাঁরা দুজন (বুখারী ও মুসলিম) সনদ সহ এগুলো নিজ নিজ সহীহ কিতাবে উল্লেখ (ইখরাজ) করেন নি। আর আল্লামা যাহাবীও তালখীস গ্রন্থে হাকিম নিশাপুরীর সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন: ৪৬৬৯ নং হাদীসটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের শর্তে সহীহ। (দ্রঃ আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন,খ:৩,৩৩২-৩৩৩, হাদীস নং ৪৬৬৯)
হাফেয আবুল কাসেম ইবনে আসাকির দামেশক্বী এবং হাফেয জুওয়াইনী শাহর ইবনে হাওশাব থেকে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি (শাহর ইবনে হাওশাব) বলেন: আমি হযরত উম্মে সালামার নিকটে ছিলাম।অত:পর এক ব্যক্তি সেখানে প্রবেশের অনুমতি চাইল।
হযরত উম্মে সালামা তার নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলল:আমি হযরত আলীর আযাদ কৃত গোলাম (দাস) আবূ সাবিত।
হযরত উম্মে সালামা বললেন: শাবাশ হে আবূ সাবিত, প্রবেশ কর। তখন তিনি তাকে বললেন: হে আবূ সাবিত! যখন দিল (অন্তর) সমূহ কোনো না কোনো এক দিকে ধাবিত ও আকৃষ্ট হয়েছিল তখন তোমার দিল (অন্তর) কোন্ দিকে ঝুঁকেছিল?
আবূ সাবিত বললেন: হযরত আলীকে অনুসরণ করার দিকে।
হযরত উম্মে সালামা বললেন: তাহলে তুমি কামিয়াব (সফলকাম) হয়েছ। শপথ ঐ স্রষ্টার যাঁর (কুদরত ও শক্তির) হাতে রয়েছে আমার জান (জীবনপ্রাণ), আমি হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে তিনি বলছিলেন: আলী, সত্য (হক্ব) ও পবিত্র কুরআনের সাথে এবং সত্য (হক্ব) ও পবিত্র কুরআনও আলীর সাথে,আর এ দুটি (সত্য ও কুরআন এবং হযরত আলী) হাওযে কাওসারে আমার কাছে প্রবেশ করা পর্যন্ত কখনো পৃথক হবে না।
علي مع الحق و القرآن،و الحق و القرآن مع علي،لن یفترقا حتی یردا علي الحوض.
[দ্রঃ তারীখু দিমাশক, ইমাম আলীর অধ্যায়, খ:৩,পৃ:১৫৩,হাদীস নং ১১৭২; ফারায়েদুস সিমতাইন, খ:১,পৃ:১৭৭, হাদীস নং ১৭৭ হাক্ব্ ব আলী আস্ত (সত্য আলীর সাথে) পৃ:৮৪ থেকে উদ্ধৃত]
হাদীস নং ৪৬৮৬।উম্মে সালমা বলেন: আমি হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি: আলী কুরআনের সাথে এবং কুরআন আলীর সাথে; এ দুটো হাউযে কাওসারে আমার কাছে উপনীত হওয়া পর্যন্ত কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না।
এটা সহীহুল ইসনাদ হাদীস.....
আল্লামা যাহাবীও তালখীস গ্রন্থে হাকিম নিশাপূরীর সাথে একমত পোষণ করে বলেছেন: সহীহ এবং আবূ সাঈদ আকীসা সিকাহ্ ও বিশ্বস্ত। (দ্রঃ আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন খ:৩,পৃ:৩৩৭)
পবিত্র কুরআনের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা.) আহলুল বাইতের (আ.) অবিচ্ছেদ্য অটুট সম্পর্ক বিদ্যমান যার প্রমাণ মুতাওয়াতির অর্থাৎ অকাট্য সূত্রে বর্ণিত হাদীস-ই সাকালাইন।
অতএব রাসূলুল্লাহর সকল খাঁটি সুন্নাহ কেবল আহলুল বাইতের (আ.) কাছেই সংরক্ষিত (মাহফূয) আছে যার প্রমাণ মুতাওয়াতির হাদীস-ই সাকালাইন।
আর তাই বনী উমাইয়া খিলাফত রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহর বিকৃতি (তাহরীফ) ও পরিবর্তন (তাঘয়ীর) সাধন করলেও আসলে রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রকৃত সুন্নাহ আহলুল বাইতের (আ.) মাধ্যমেই সংরক্ষিত হয়েছে।
মুসলিম উম্মাহ যদি পবিত্র কুরআন ও মহানবীর (সা.) আহলুল বাইতকে (আ.) দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধরে [তামাসসুক করে অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের শিক্ষা, আদর্শ, বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধ ইত্যাদি এবং আহলুল বাইতের [আ.] বাণী, কাজ-কর্ম, অনুমোদন, শিক্ষা-দীক্ষা, আদর্শ, আদেশ ও নিষেধ নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ, পালন এবং তাঁদের আনুগত্য করে] তাহলে তারা (উম্মত) হেদায়ত প্রাপ্ত হবে । আর উম্মাহ আহলুল বাইতের (আ.) কাছ থেকে পবিত্র কুরআনের সঠিক ও প্রকৃত ব্যাখ্যা (তাফসীর) এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) সহীহ, সঠিক খাঁটি সুন্নাহ সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞান লাভ করে হালাক (ধ্বংস) হওয়া থেকে নাজাত পাবে। তবে এতদ সংশ্লিষ্ট আরো বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী পর্ব ৪খ-এ আসছে।
চলবে…
ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান
আপনার কমেন্ট